আপনি কি জানেন যে আপনি আংশিক সত্য জানতেন?
রাজীব
দুনিয়াজুড়ে এমন অসংখ্য আবিষ্কার রয়েছে যার আবিষ্কারক একজন নন। একই আবিষ্কারের পেছনে একই সময় একাধিক উদ্ভাবক গবেষণা করেছেন এবং দুই বা ততধিক ব্যক্তিই সফলতা লাভ করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে আমরা এখন শুধু একজন আবিষ্কারকের কথাই জানি, কারণ চূড়ান্ত পর্যায়ে সব ক্রেডিট তুলে দেয়া হয়েছে একজনের হাতেই। তবে সাধারণ জনগণ না জানলেও ইতিহাসের পাতায় ঠিকই বাকি উদ্ভাবকদের অবদানের কথা লেখা আছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে এমন কিছু আবিষ্কার ও তার নেপথ্য কাহিনী রয়েছে এই প্রতিবেদনে।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস কোনোভাবেই উত্তর আমেরিকা মহাদেশে পা রাখা প্রথম ব্যক্তি নন
কলম্বাস প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন একথা প্রায় সবাই জানলেও এখানে কিছু ফাঁকি আছে। আধুনিক যুগে এসে কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করলেও তিনি কোনোভাবেই উত্তর আমেরিকা মহাদেশে পা রাখা প্রথম ব্যক্তি নন। বর্তমানে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, নরওয়ের বাসিন্দা লিফ এরিকসনের (৯৭০-১০২০ খ্রি.) নেতৃত্বে একদল ভাইকিং প্রথম আমেরিকা মহাদেশে পা রাখে এবং তা কলম্বাসের আমেরিকা যাওয়ার আরও প্রায় পাঁচশ’ বছর আগে। অভিযাত্রী দলটি স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে রওনা হয়ে নিউফাউন্ডল্যান্ডে পৌঁছায়। বর্তমানে শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, ভাইকিংরা গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার উপকূলে তাদের আবাস গড়ে তুলেছিল। এছাড়াও প্রাচীন ফোনিশিয়ান জাতিরা (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০-খ্রিস্টপূর্ব ৩০০) প্রথম উত্তর আমেরিকায় পা রেখেছিলেন এমন বেশকিছু প্রমাণ পাওয়া যায় এবং এটি ঘটেছিল কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আরও কমপক্ষে ১০০০ বছর আগে। যদিও কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেননি তবু কলম্বাসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো আধুনিক যুগে এসে আমেরিকা মহাদেশকে পুনঃআবিষ্কার করা, তাছাড়া পৃথিবী সমতল নয় এই তত্ত্বকে প্রমাণিত করা।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল প্রথম টেলিফোন আবিষ্কারক ননু
ভাগ্য কখনও কখনও খুব নির্দয় হয়, যেমন হয়েছে এলিশা গ্রের ক্ষেত্রে। মূলত বেল টেলিফোন যন্ত্রের প্রথম পেটেম্লট করেছিলেন কিন্তু প্রথম আবিষ্কারক তিনি নন। এই দাবি করতে পারেন অ্যান্তেনিও মিউচি। তিনি ১৮৫৭ সালে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক টেলিফোন আবিষ্কারের গবেষণায় সফলতা লাভ করেন। ১৮৬৫ সালে ইতালিয়ান আবিষ্কারক ইনোচেনযো মেনজাডি একটি স্পিকিং টেলিফোন আবিষ্কার করেন। হাঙ্গেরিয়ান আবিষ্কারক থিবেদার পুশকাস সুইচবোর্ড ও পার্টি লাইন আবিষ্কার করে টেলিফোনকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলেন। তবে এরা বেলের প্রধান প্রতিযোগী নন। বেলের প্রধান প্রতিযোগী হলেন আমেরিকান উদ্ভাবক এলিশা গ্রে। মজার ব্যাপার হলো তিনি এবং বেল একই দিন (১৮৭৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি) পেটেম্লট অফিসে যান টেলিফোন যন্ত্রের নিবন্ধন করার জন্য। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে গ্রে-র আইনজীবী বেলের চেয়ে কয়েকঘণ্টা পরে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বেলই টেলিফোন আবিষ্কারের কৃতিত্ব লাভ করেন।
চার্লস ডারউইন কখনোই বিবর্তনবাদ ধারণার প্রথম প্রবক্তা নন
ডারউইনকে বিবর্তনবাদের জনক বলা যায় এই কারণে যে তিনি বিবর্তনবাদের ধারণাকে আরও পরিমার্জিত করেন এবং এর আধুনিক তত্ত্ব তিনি প্রকাশ করেন। কিন্তু ডারউইন কখনোই বিবর্তনবাদ ধারণার প্রথম প্রবক্তা নন।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যানেক্সিমেন্ডার (খ্রিস্টপূর্ব ৬১০-খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৫) প্রথম ঐশ্বরিক উপায় ছাড়াই জীবজন্তু বা উদ্ভিদের জন্মের কথা বলেন। তার দাবি ছিল বংশবিস্তারে শারীরিক ভূমিকাই সব, কোনো সুপারন্যাচারাল পাওয়ার নয়। যাই হোক আধুনিক বিবর্তনবাদ নিয়ে প্রথম যুক্তিসঙ্গত ধারণা দেন ফ্রেঞ্চ গণিতবিদ পিয়েরে লুইস মোপারচিও এবং চার্লস ডারউইনের দাদা ইরাসমাস ডারউইন। ফ্রেঞ্চ প্রকৃতিবিজ্ঞানী জেন ব্যাপটিস্ট লেমার্ক বিবর্তনবাদ নিয়ে জোরালো একটি ধারণা পেশ করেন। তিনি ধারণা দিয়েছিলেন, প্রজাতির মধ্যে থাকা এক ধরনের ন্যাচারাল ফোর্স যা অর্গানিজমের মূল চাবিকাঠি এবং এর মাঝে থাকা এনভায়রনমেন্টাল ফোর্স তাদের স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী করে তোলে। তবে ডারউইনরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ইংরেজ প্রকৃতিবিজ্ঞানী আলফ্রেড ওয়ালেচ। যিনি ১৮৫৮ সালে প্রেস্টিজিস লিননেন সোসাইটিতে ন্যাচারাল সেকশনে বিবর্তনবাদের ওপর একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন, যা চার্লস ডারউইনের তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ডারউইনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তার বই ‘দি অরিজিন অব স্পেসিস’। মূলত এই বইয়ের ফলে বিবর্তনবাদ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বিবর্তনবাদের প্রথম প্রচারক ও জনক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। অন্যরা যেখানে কোনো ক্রেডিটই পাননি।
টমাস এডিসন প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক নন, তিনি মূলত বাতিটির উন্নয়নে কাজ করেছেন
আরও একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য হলো টমাস এডিসন প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক। ইলেকট্রিক্যাল বাল্ব আবিষ্কারের কৃতিত্ব এককভাবে কাউকে দেয়া যায় না। যদি দিতে হয় তবে হামফ্রে ডেভিকে দেয়া যায়। এর আবিষ্কার ও আধুনিকায়নে একাধিক উদ্ভাবকের হাত রয়েছে। মূলত এডিসন বাতিটি ডেভেলপে কাজ করেছেন। এডিসনের জন্মেরও আগে ১৮০২ সালে ইংরেজ কেমিস্ট হামফ্রে ডেভি একফালি শীর্ণ প্লাটিনামের পাতের মাঝে বিদুত্প্রবাহ চালান এবং এর ফলে ইলেকট্রিক বাল্ব আবিষ্কার করেন। যদিও এই বাল্ব ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। এরপর থেকে গবেষণা চলতে থাকে উন্নত ও টেকসই ফিলামেন্ট আবিষ্কারের। এরই ধারাবাহিকতায় ইংরেজ উদ্ভাবক আলফ্রেড ডি মলিনস ১৮৪১ সালে একটি ভ্যাকুয়ামে প্লাটিনামের তার ব্যবহার করে তাতে বিদ্যুত্ প্রবাহ করে আরও দীর্ঘস্থায়ী একটি ইলেকট্রিক বাল্ব আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম ইনক্যানডেসন্ট ল্যাম্পের পেটেম্লট করান। তবে তার আবিষ্কৃত এই বাল্বের প্রতিস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এত বেশি ছিল যে তার এই আবিষ্কার জনপ্রিয়তা লাভ করেনি।
এরপর থেকে গবেষণা চলতে থাকে একই সঙ্গে সাশ্রয়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী ফিলামেন্ট আবিষ্কারের। শেষপর্যন্ত ১৮৭৯ সালে এডিসন আবিষ্কার করেন কার্বনাইজড ব্যাম্বু ফিলামেন্ট। যা ১২০০ ঘণ্টার মতো জ্বলতে পারত এবং খরচের দিক থেকেও ছিল সাশ্রয়ী। প্রায় একই সময়ে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জোশেপ সোয়ানও একটি ইলেকট্রিক বাল্ব আবিষ্কার করেন। কিন্তু ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে এডিসনের ধারেকাছেও যেতে পারেননি তিনি। এডিসন দ্রুত তার বাল্বের পেটেম্লট নেন এবং তা স্থাপন করতে থাকেন। যার ফলে সবাইকে ছাড়িয়ে এডিসনের বাল্বই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। একথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে ইলেকট্রিক বাল্বকে আধুনিকায়ন এবং সাশ্রয়ী করার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান টমাস এডিসন, কিন্তু একথাও দাবি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই যে এডিসনই প্রথম বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কার করেন।
CRICKET LIVE STREAMING
Showing posts with label আমার দেশ. Show all posts
Showing posts with label আমার দেশ. Show all posts
Monday, August 1, 2011
রোজার গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান
রোজার গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান
মুহাম্মদ তৈয়্যেব হোসাইন
রোজার নিয়তের সময় : সুবহে সাদিকের আগেই নিয়ত করে নেয়া উত্তম। যদি সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত না করে থাকে তবে সূর্য ঢলে যাওয়ার অর্থাত্ দুপুরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যাবে। এরপর নিয়তের গ্রহণযোগ্যতা শেষ হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট দিবসের মানতকৃত রোজার নিয়তও অর্ধদিবস তথা সূর্য ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত করা যায়। তবে কাজা, কাফফারা এবং অনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগেই করে নিতে হবে। কাফফারা ও অনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পর গ্রহণযোগ্য নয়।
সুনির্দিষ্ট দিবসের রোজার মানত হচ্ছে এই যে, কেউ এই বলে মানত করল যে, আমার অমুক কাজটি যদি হয়ে যায় তবে আমি শুক্রবার রোজা রাখব। এখন এই জুমার দিনের রোজা মানতকারীর জন্য সুনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজা হিসেবে পরিগণিত হবে। আর অনির্দিষ্ট দিবসের রোজার মানত হচ্ছে নিম্নরূপ। কেউ এই বলে মানত করল যে, আমার অমুক কাজটি যদি হয়ে যায় তবে আমি একটি রোজা রাখব। তাকে নজরে গাইরে মুয়াইয়ান ‘অনির্দিষ্ট মান্নত’ বলা হয়।
যেসব কারণে রোজা ভাঙা যায় : রোজা রাখার কারণে অসুস্থ ব্যক্তির অসুখ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে অথবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকলে, মুসাফির সফররত অবস্থায় থাকলে, অতিশয় বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে গেলে, গর্ভবতীর গর্ভের সন্তানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, দুগ্ধদানকারী মা’র দুধ শুকিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা জাগলে তারা রোজা ভাঙতে পারবেন এবং এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতিও শরিয়ত প্রদান করে।
রোজাবস্থায় বমি হলে : অনিচ্ছাকৃত বমি হলে রোজার ক্ষতি হবে না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভরে বমি করলে রোজা ভেঙে যাবে।
সন্দেহ বা সংশয় দিবসে রোজা : যদি ৩০ শাবান এবং ১ রমজানের মধ্যে সন্দেহ হয় অর্থাত্ শাবানের ২৯তম রাতে চন্দ্র উদিত হওয়ার স্থান মেঘাচ্ছন্ন অথবা কুয়াশার কারণে আকাশ যদি পরিষ্কার না থাকে এবং চাঁদ দেখা না যায়, সেসঙ্গে শরিয়তে গ্রহণযোগ্য উপায়ে চাঁদ দেখার সংবাদও না আসে, তবে এই সন্দেহের দিন (৩০ শাবান) সাধারণ মানুষের জন্য রোজা রাখা উচিত নয়।
রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে স্পর্শ ও চুম্বন প্রসঙ্গে : যদি শুধু স্ত্রীকে স্পর্শ বা চুম্বন করার কারণে বীর্যপাত হয়ে যায় তাহলে শুধু রোজার কাজা করতে হবে। আর যদি সহবাসের কারণে বীর্যপাত ঘটে তবে কাজা, কাফফারা উভয়ই বাধ্যতামূলক হবে।
রোজাবস্থায় গ্লুকোজ ইনজেকশন নেয়া : অত্যাবশ্যকীয় কারণে (ওজরবশত) গ্লুকোজ ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না বটে; কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় কারণ (ওজর) ছাড়া তা নেয়া মাকরুহ। তথাপি শক্তিবর্ধক ইনকেজশন প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করার দ্বারা রোজা মাকরুহ হয়ে যায়।
রোজাদারের মুখ থেকে রক্ত বের হলে : রোজাদারের দাঁত ও মুখের অভ্যন্তরের জখম থেকে রক্ত নির্গত হয়ে যদি গলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আরো গভীরে চলে যায় তবে রোজা ভেঙে যাবে, অন্যথায় ভাঙবে না।
রোজাবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করলে : রোজাবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করা মাকরুহ। যদি তা গলায় না পৌঁছে তবে রোজা ভাঙবে না।
রোজাদার রাত মনে করে ফজরের পর স্ত্রী সহবাস করলে : যদি রাত মনে করে স্ত্রী সহবাস করে ফেলে এবং পরে জানতে পারে যে, সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছিল তবে ওই ব্যক্তির রোজা নষ্ট হয়ে যাবে বটে, কিন্তু সেই রোজার শুধু কাজা করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না।
রোজাদার যদি পান, গুল মুখে নিয়ে ঘুমায় : ঘুমানোর আগে যদি মুখে পান বা গুল নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে এবং সুবহে সাদিকের পর জাগ্রত হয়, তবে মুখে পান থাকুক আর না থাকুক রোজা ভেঙে যাবে। সেই রোজার কাজা করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না। আর রাতে ঘুমানোর আগে যদি পান খেয়ে তা ফেলে দেয়ার পরও পানের বা সুপারির ছোট ছোট টুকরো থেকে যায়, যদি তা কণা বা তার চেয়ে বড় হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। অন্যথায় ভাঙবে না। কিন্তু পান খাওয়ার পর মুখে যে লাল রঙ থেকে যায় তার দ্বারা রোজা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। গুলের হুকুমও অনুরূপ।
এক দেশে রোজা রেখে অন্য দেশে ইফতার : রোজা রাখা এবং ইফতারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি যেখানে উপস্থিত সেখানকার সময়ই ধর্তব্য। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি জেদ্দায় রোজা রেখে ইফতারের সময় ঢাকায় উপস্থিত থাকে, তবে সে ব্যক্তি ঢাকার সময় অনুযায়ী ইফতার করবে। অনুরূপভাবে কেউ ঢাকায় রোজা রেখে যদি জেদ্দা গমন করে তবে জেদ্দার হিসাব অনুযায়ী সে ব্যক্তি ইফতার করবে।
বিমানে যাত্রীদের ইফতার : আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো সাধারণত ৩৫ হাজার ফুট ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে চলতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী দেখা যায়, এ সময় স্থলভাগে সূর্য ডুবে গেছে। অথচ ফ্লাইট অনেক ওপর দিয়ে চলন্ত অবস্থায় সূর্য দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। এমতাবস্থায় রোজাদার যেখানে উপস্থিত সেখানকার হিসাব অনুযায়ী ইফতার করবে। অতএব, যাত্রীরা যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য দেখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইফতার করতে পারবে না। ভূমিতে সূর্য ডুবে গেলেও।
মুহাম্মদ তৈয়্যেব হোসাইন
রোজার নিয়তের সময় : সুবহে সাদিকের আগেই নিয়ত করে নেয়া উত্তম। যদি সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত না করে থাকে তবে সূর্য ঢলে যাওয়ার অর্থাত্ দুপুরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যাবে। এরপর নিয়তের গ্রহণযোগ্যতা শেষ হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট দিবসের মানতকৃত রোজার নিয়তও অর্ধদিবস তথা সূর্য ঢলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত করা যায়। তবে কাজা, কাফফারা এবং অনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগেই করে নিতে হবে। কাফফারা ও অনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের পর গ্রহণযোগ্য নয়।
সুনির্দিষ্ট দিবসের রোজার মানত হচ্ছে এই যে, কেউ এই বলে মানত করল যে, আমার অমুক কাজটি যদি হয়ে যায় তবে আমি শুক্রবার রোজা রাখব। এখন এই জুমার দিনের রোজা মানতকারীর জন্য সুনির্দিষ্ট দিবসের মানতের রোজা হিসেবে পরিগণিত হবে। আর অনির্দিষ্ট দিবসের রোজার মানত হচ্ছে নিম্নরূপ। কেউ এই বলে মানত করল যে, আমার অমুক কাজটি যদি হয়ে যায় তবে আমি একটি রোজা রাখব। তাকে নজরে গাইরে মুয়াইয়ান ‘অনির্দিষ্ট মান্নত’ বলা হয়।
যেসব কারণে রোজা ভাঙা যায় : রোজা রাখার কারণে অসুস্থ ব্যক্তির অসুখ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে অথবা সুস্থ হতে বিলম্ব হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকলে, মুসাফির সফররত অবস্থায় থাকলে, অতিশয় বার্ধক্যের কারণে দুর্বল হয়ে গেলে, গর্ভবতীর গর্ভের সন্তানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, দুগ্ধদানকারী মা’র দুধ শুকিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা জাগলে তারা রোজা ভাঙতে পারবেন এবং এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতিও শরিয়ত প্রদান করে।
রোজাবস্থায় বমি হলে : অনিচ্ছাকৃত বমি হলে রোজার ক্ষতি হবে না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভরে বমি করলে রোজা ভেঙে যাবে।
সন্দেহ বা সংশয় দিবসে রোজা : যদি ৩০ শাবান এবং ১ রমজানের মধ্যে সন্দেহ হয় অর্থাত্ শাবানের ২৯তম রাতে চন্দ্র উদিত হওয়ার স্থান মেঘাচ্ছন্ন অথবা কুয়াশার কারণে আকাশ যদি পরিষ্কার না থাকে এবং চাঁদ দেখা না যায়, সেসঙ্গে শরিয়তে গ্রহণযোগ্য উপায়ে চাঁদ দেখার সংবাদও না আসে, তবে এই সন্দেহের দিন (৩০ শাবান) সাধারণ মানুষের জন্য রোজা রাখা উচিত নয়।
রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে স্পর্শ ও চুম্বন প্রসঙ্গে : যদি শুধু স্ত্রীকে স্পর্শ বা চুম্বন করার কারণে বীর্যপাত হয়ে যায় তাহলে শুধু রোজার কাজা করতে হবে। আর যদি সহবাসের কারণে বীর্যপাত ঘটে তবে কাজা, কাফফারা উভয়ই বাধ্যতামূলক হবে।
রোজাবস্থায় গ্লুকোজ ইনজেকশন নেয়া : অত্যাবশ্যকীয় কারণে (ওজরবশত) গ্লুকোজ ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না বটে; কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় কারণ (ওজর) ছাড়া তা নেয়া মাকরুহ। তথাপি শক্তিবর্ধক ইনকেজশন প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ব্যবহার করার দ্বারা রোজা মাকরুহ হয়ে যায়।
রোজাদারের মুখ থেকে রক্ত বের হলে : রোজাদারের দাঁত ও মুখের অভ্যন্তরের জখম থেকে রক্ত নির্গত হয়ে যদি গলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আরো গভীরে চলে যায় তবে রোজা ভেঙে যাবে, অন্যথায় ভাঙবে না।
রোজাবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করলে : রোজাবস্থায় টুথপেস্ট ব্যবহার করা মাকরুহ। যদি তা গলায় না পৌঁছে তবে রোজা ভাঙবে না।
রোজাদার রাত মনে করে ফজরের পর স্ত্রী সহবাস করলে : যদি রাত মনে করে স্ত্রী সহবাস করে ফেলে এবং পরে জানতে পারে যে, সুবহে সাদিক হয়ে গিয়েছিল তবে ওই ব্যক্তির রোজা নষ্ট হয়ে যাবে বটে, কিন্তু সেই রোজার শুধু কাজা করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না।
রোজাদার যদি পান, গুল মুখে নিয়ে ঘুমায় : ঘুমানোর আগে যদি মুখে পান বা গুল নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে এবং সুবহে সাদিকের পর জাগ্রত হয়, তবে মুখে পান থাকুক আর না থাকুক রোজা ভেঙে যাবে। সেই রোজার কাজা করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না। আর রাতে ঘুমানোর আগে যদি পান খেয়ে তা ফেলে দেয়ার পরও পানের বা সুপারির ছোট ছোট টুকরো থেকে যায়, যদি তা কণা বা তার চেয়ে বড় হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। অন্যথায় ভাঙবে না। কিন্তু পান খাওয়ার পর মুখে যে লাল রঙ থেকে যায় তার দ্বারা রোজা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। গুলের হুকুমও অনুরূপ।
এক দেশে রোজা রেখে অন্য দেশে ইফতার : রোজা রাখা এবং ইফতারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি যেখানে উপস্থিত সেখানকার সময়ই ধর্তব্য। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি জেদ্দায় রোজা রেখে ইফতারের সময় ঢাকায় উপস্থিত থাকে, তবে সে ব্যক্তি ঢাকার সময় অনুযায়ী ইফতার করবে। অনুরূপভাবে কেউ ঢাকায় রোজা রেখে যদি জেদ্দা গমন করে তবে জেদ্দার হিসাব অনুযায়ী সে ব্যক্তি ইফতার করবে।
বিমানে যাত্রীদের ইফতার : আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো সাধারণত ৩৫ হাজার ফুট ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে চলতে থাকে। ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী দেখা যায়, এ সময় স্থলভাগে সূর্য ডুবে গেছে। অথচ ফ্লাইট অনেক ওপর দিয়ে চলন্ত অবস্থায় সূর্য দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। এমতাবস্থায় রোজাদার যেখানে উপস্থিত সেখানকার হিসাব অনুযায়ী ইফতার করবে। অতএব, যাত্রীরা যতক্ষণ পর্যন্ত সূর্য দেখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইফতার করতে পারবে না। ভূমিতে সূর্য ডুবে গেলেও।
খো শ আ ম দে দ : রমজানুল মুবারক
খো শ আ ম দে দ : রমজানুল মুবারক
মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার
পরম রাব্বুল আলামিনের খাস রহমত, বরকত ও নেয়ামতের মহান মাস রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে আবার ফিরে এসেছে। বিশ্বে শত-কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান রোজা পালনের মাধ্যমে এই মাসটি মহাখুশি ও আনন্দ সহকারে পালন করে। মুসলিম মূল্যবোধের প্রশিক্ষণে এই পবিত্র মাসের গুরুত্ব, মরতবা ও ফজিলত অপরিসীম। রোজা পালন সম্পর্কে আল্লাহপাক কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন—‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু কুতিবা আলাইকুমুস সিয়ামু কামা কুতিবা আলাল্লাজিনা মিন কাবলিকুম লাআল্লাকুম তাত্তাকুন।’ অর্থাত্ হে মোমিন বান্দাগণ, তোমাদের ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল। যাতে তোমরা সাধুত্ব, পরিশুদ্ধতা লাভ করতে পার। অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে—তোমাদের কেউ রমজানুল মুবারকের মাসপ্রাপ্ত হলে সে যেন তখন রোজা রাখে। আরবি বারো চাঁদের মধ্যে রমজানুল মুবারক মাহিনার মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও ফজিলত অতীব তাত্পর্যবহ; যা মানব জীবনকে পবিত্রময়-সুন্দর করে এবং আখেরাতে নাজাতপ্রাপ্তি ও শান্তির নিশ্চয়তা দেয়। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য বোধ এবং আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা ও অনুশীলনে রমজানুল মুবারকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সত্য-অসত্য, পাক-পুণ্য এবং ভালো-মন্দের যথার্থ উপলব্ধির মাধ্যমে মানবজীবনকে মহীয়ান ও সফল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই রমজানুল মুবারকের শুভ আগমন।
আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে রমজানের রোজা পালন জীবনকে করে পূত-পবিত্র ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত। এক কথায় মাহে রমজানের ত্যাগ ও সংযমের মহান শিক্ষা দিয়ে আমাদের প্রতি পরম রাব্বুল আলামিনের রহমত ও বরকতের পাল্লা ভারী করে। অন্যদিকে সমাজ জীবনে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রমজানের গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। ধনী-গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে আমরা এই মহান পবিত্র মাসে পরস্পর একাত্ম হই। এছাড়া ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া কবুল, দুনিয়া-আখেরাতের নাজাত, মুক্তি ও শান্তি লাভ এবং সবরকম পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির জন্য রমজানুল মুবারকের উদ্দেশ্য আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। পবিত্র মাহে রমজানের মর্যাদা, তাত্পর্য, মরতবা ও ফজিলত প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের জন্য নেয়ামতস্বরূপ। এই রমজানুল মুবারকে বিশ্ব মানুষের সংবিধান পবিত্র কোরআনুল কারিম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অবতীর্ণ করেছেন এবং বলেছেন, রোজা আমারই জন্য রাখা হয়, আমি স্বয়ং রোজাদারদের পুরস্কৃত করব এবং যে বা যারা রিপু দমন করে খাঁটি পথে অটল থাকে তাকে আমি অগণিত সওয়াব প্রদান করব। পবিত্র ইসলামে পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা তৃতীয়। রমজানের এই রোজা পালন গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ইবাদত,। এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের সর্বাধিক ত্যাগ, সংযম, ধৈর্য ও কষ্ট-সহিষ্ণুতার প্রমাণ মেলে এবং আমরা শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আত্মিকসহ সব ক্ষেত্রে রমজান মাসের রোজা পালনে অগণিত সওয়াব লাভ করি। হজরত ওমর ফারুক (রা.) বর্ণনা করে বলেছেন, হজরত রাসুলে মকবুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, পবিত্র মাহে রমজান আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বান্দাাকুলের জন্য আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও রহমত-বরকত, সচ্ছলতা ও নেয়ামতের বারিধারা বর্ষিত হতে থাকে। এছাড়াও একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রমজানুল মুবারকের বরকতে বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজা বন্ধ করা হয় ও শয়তানকে বন্ধ রাখা হয়। আরও একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, রমজান মাসের রোজা পালনকারী ফেরেশতা, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ এমনকি বিশ্ব ভুবনের সমুদয় প্রাণী জগত বরকত ও নেয়ামতপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে পবিত্র রমজান মাস সম্পর্কে মূল্যবান উদ্ধৃতি রয়েছে। তিবরানি, আহমদ ও তিরমিজি শরীফে মাহে রমজান সম্পর্কে বলা হয়েছে—রমজানুল মুবারক রহমত, বরকত, নেয়ামত ও গোনাহ-পাপরাজি ক্ষমা পাওয়া ও দোয়া ফরিয়াদ কবুলিয়াতের মাস। এই পবিত্র মাসে সব ফেরেশতা প্রত্যহ মানুষের উদ্দেশে বলেন—হে কল্যাণ, শুভকামনা অনুসন্ধানকারী! মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কথা স্মরণ কর। তাঁর জিকির, তাসবিহ-তাহলিলে রত হও, কায়মনে দু’চোখ খুলে তওবা-ইস্তেগফার কর। তোমরা এই রমজানুল মুবারকে যা কামনা বা ইচ্ছা করবে, আল্লাহপাক কবুল করে নেবেন। শুধু তাই নয়, এই রহমতের মাসে অগণিত দোজখিকে নাজাত দিয়ে দেন।
অতএব আসুন, এই রমজানুল মুবারকের মাসের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও পবিত্রতা বজায় রেখে সত্যিকারভাবে আল্লাহপাকের নিমিত্ত রোজা পালন, তারাবি আদায়, ইফতার, সাহরি, দান-খয়রাত, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, যাকাত, ফেতরা, পবিত্র শবেকদর পালন, ইতেকাফ এবং ঈদ উদযাপন ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যেই মূলত ইবাদত-বন্দেগি তথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমত, বরকত এবং নেয়ামত বর্ষিত হবে। প্রকৃত শান্তি, মুক্তি ও মহামঙ্গল রমজানুল মুবারকের বদৌলতে জীবনকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করে গড়ে তুলি। আল্লাহপাক বিশ্বের সব রোজাদারের সিয়াম সাধনা কবুল করুন।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মিশন
মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার
পরম রাব্বুল আলামিনের খাস রহমত, বরকত ও নেয়ামতের মহান মাস রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে আবার ফিরে এসেছে। বিশ্বে শত-কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমান রোজা পালনের মাধ্যমে এই মাসটি মহাখুশি ও আনন্দ সহকারে পালন করে। মুসলিম মূল্যবোধের প্রশিক্ষণে এই পবিত্র মাসের গুরুত্ব, মরতবা ও ফজিলত অপরিসীম। রোজা পালন সম্পর্কে আল্লাহপাক কোরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন—‘ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু কুতিবা আলাইকুমুস সিয়ামু কামা কুতিবা আলাল্লাজিনা মিন কাবলিকুম লাআল্লাকুম তাত্তাকুন।’ অর্থাত্ হে মোমিন বান্দাগণ, তোমাদের ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল। যাতে তোমরা সাধুত্ব, পরিশুদ্ধতা লাভ করতে পার। অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে—তোমাদের কেউ রমজানুল মুবারকের মাসপ্রাপ্ত হলে সে যেন তখন রোজা রাখে। আরবি বারো চাঁদের মধ্যে রমজানুল মুবারক মাহিনার মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও ফজিলত অতীব তাত্পর্যবহ; যা মানব জীবনকে পবিত্রময়-সুন্দর করে এবং আখেরাতে নাজাতপ্রাপ্তি ও শান্তির নিশ্চয়তা দেয়। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য বোধ এবং আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা ও অনুশীলনে রমজানুল মুবারকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সত্য-অসত্য, পাক-পুণ্য এবং ভালো-মন্দের যথার্থ উপলব্ধির মাধ্যমে মানবজীবনকে মহীয়ান ও সফল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই রমজানুল মুবারকের শুভ আগমন।
আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে রমজানের রোজা পালন জীবনকে করে পূত-পবিত্র ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত। এক কথায় মাহে রমজানের ত্যাগ ও সংযমের মহান শিক্ষা দিয়ে আমাদের প্রতি পরম রাব্বুল আলামিনের রহমত ও বরকতের পাল্লা ভারী করে। অন্যদিকে সমাজ জীবনে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রমজানের গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম। ধনী-গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে আমরা এই মহান পবিত্র মাসে পরস্পর একাত্ম হই। এছাড়া ইবাদত-বন্দেগি, দোয়া কবুল, দুনিয়া-আখেরাতের নাজাত, মুক্তি ও শান্তি লাভ এবং সবরকম পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির জন্য রমজানুল মুবারকের উদ্দেশ্য আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। পবিত্র মাহে রমজানের মর্যাদা, তাত্পর্য, মরতবা ও ফজিলত প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের জন্য নেয়ামতস্বরূপ। এই রমজানুল মুবারকে বিশ্ব মানুষের সংবিধান পবিত্র কোরআনুল কারিম আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অবতীর্ণ করেছেন এবং বলেছেন, রোজা আমারই জন্য রাখা হয়, আমি স্বয়ং রোজাদারদের পুরস্কৃত করব এবং যে বা যারা রিপু দমন করে খাঁটি পথে অটল থাকে তাকে আমি অগণিত সওয়াব প্রদান করব। পবিত্র ইসলামে পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রোজা তৃতীয়। রমজানের এই রোজা পালন গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি একক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ইবাদত,। এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষের সর্বাধিক ত্যাগ, সংযম, ধৈর্য ও কষ্ট-সহিষ্ণুতার প্রমাণ মেলে এবং আমরা শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আত্মিকসহ সব ক্ষেত্রে রমজান মাসের রোজা পালনে অগণিত সওয়াব লাভ করি। হজরত ওমর ফারুক (রা.) বর্ণনা করে বলেছেন, হজরত রাসুলে মকবুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, পবিত্র মাহে রমজান আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বান্দাাকুলের জন্য আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও রহমত-বরকত, সচ্ছলতা ও নেয়ামতের বারিধারা বর্ষিত হতে থাকে। এছাড়াও একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রমজানুল মুবারকের বরকতে বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজা বন্ধ করা হয় ও শয়তানকে বন্ধ রাখা হয়। আরও একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, রমজান মাসের রোজা পালনকারী ফেরেশতা, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ এমনকি বিশ্ব ভুবনের সমুদয় প্রাণী জগত বরকত ও নেয়ামতপ্রাপ্ত হয়। এছাড়া বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে পবিত্র রমজান মাস সম্পর্কে মূল্যবান উদ্ধৃতি রয়েছে। তিবরানি, আহমদ ও তিরমিজি শরীফে মাহে রমজান সম্পর্কে বলা হয়েছে—রমজানুল মুবারক রহমত, বরকত, নেয়ামত ও গোনাহ-পাপরাজি ক্ষমা পাওয়া ও দোয়া ফরিয়াদ কবুলিয়াতের মাস। এই পবিত্র মাসে সব ফেরেশতা প্রত্যহ মানুষের উদ্দেশে বলেন—হে কল্যাণ, শুভকামনা অনুসন্ধানকারী! মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কথা স্মরণ কর। তাঁর জিকির, তাসবিহ-তাহলিলে রত হও, কায়মনে দু’চোখ খুলে তওবা-ইস্তেগফার কর। তোমরা এই রমজানুল মুবারকে যা কামনা বা ইচ্ছা করবে, আল্লাহপাক কবুল করে নেবেন। শুধু তাই নয়, এই রহমতের মাসে অগণিত দোজখিকে নাজাত দিয়ে দেন।
অতএব আসুন, এই রমজানুল মুবারকের মাসের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও পবিত্রতা বজায় রেখে সত্যিকারভাবে আল্লাহপাকের নিমিত্ত রোজা পালন, তারাবি আদায়, ইফতার, সাহরি, দান-খয়রাত, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, যাকাত, ফেতরা, পবিত্র শবেকদর পালন, ইতেকাফ এবং ঈদ উদযাপন ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যেই মূলত ইবাদত-বন্দেগি তথা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমত, বরকত এবং নেয়ামত বর্ষিত হবে। প্রকৃত শান্তি, মুক্তি ও মহামঙ্গল রমজানুল মুবারকের বদৌলতে জীবনকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করে গড়ে তুলি। আল্লাহপাক বিশ্বের সব রোজাদারের সিয়াম সাধনা কবুল করুন।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মিশন
Subscribe to:
Posts (Atom)